খুরুশকুল তেতৈয়া-ভারুয়াখালী সংযোগ সেতুতে ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতি

 

নিজস্ব প্রতিবেদক

কক্সবাজারের বহুল আলোচিত খুরুশকুল তেতৈয়া-ভারুয়াখালী সংযোগ সেতু নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র ধরে সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, কোটি টাকার এই সরকারি প্রকল্পে মান নিয়ন্ত্রণের কোনো তোয়াক্কা না করেই ঠিকাদারি কাজ চলমান রয়েছে। শুরু থেকেই নির্মাণকাজে তদারকির অভাব এবং দায়িত্বপ্রাপ্তদের গাফিলতির কারণে প্রকল্পটির গুণগত মান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

কয়েক দিন আগে গুরুত্বপূর্ণ একটি গার্ডার ঢালাইয়ের মাত্র এক মাসের মধ্যেই প্রায় ১৫ ফুট অংশ ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ার ঘটনার পর অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
নিয়ম অনুযায়ী কাঁচামালের সঠিক গুণগত মান নিশ্চিত করে এবং নির্মাণসামগ্রীতে কোনো ত্রুটি না রেখে কাজ করা হলে ঢালাইয়ের পর এভাবে গার্ডার ভেঙে যাওয়ার কথা নয়। আংশিক ভেঙে পড়ার ঘটনায় পুরো গার্ডারের নির্মাণমান নিয়েই জনমনে ব্যাপক সন্দেহ তৈরি হয়েছে।

ভেঙে যাওয়া গার্ডারের অবশিষ্ট অংশে নিম্নমানের বা অনিয়মিত নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করা হয়েছে কি না—তা যাচাইয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয়রা। অন্যথায় ভবিষ্যতে এই সেতুর স্থায়িত্ব ও জননিরাপত্তা মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী।

স্থানীয়রা অভিযোগ করে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন ভেঙে যাওয়া গার্ডারের অংশ জোড়া লাগিয়েই কাজ সম্পন্ন দেখানোর অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এতে প্রকল্পের সামগ্রিক গুণগত মান ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

কক্সবাজার এলজিইডি অফিস সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি অনুমোদন পায় ২০১৭ সালের ১০ জানুয়ারি। প্রকল্পের বাজেট ধরা হয় ৩৬ কোটি ২৮ লাখ টাকা। নির্মাণকাজের দায়িত্ব পায় তমা কনস্ট্রাকশন ও এম এ জাহের লিমিটেড (জয়েন্ট ভেনচার)। এ বিষয়ে ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

চুক্তি অনুযায়ী ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে সেতুটি হস্তান্তরের কথা থাকলেও, দীর্ঘ পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো পুরো স্প্যান বসানোর কাজ শেষ হয়নি।

স্থানীয় বাসিন্দা আবু তৈয়ব জানান, গত ১৮ অক্টোবর ঢালাই করা গার্ডার মাত্র ২৫ নভেম্বর ভেঙে নিচে পড়ে যায়। পরে রাতের আঁধারে ভাঙা অংশ জোড়া লাগিয়ে সংস্কারের নামে কাজ চালানো হয়।

গণমাধ্যমকর্মী শফিক বলেন, “এটি কোটি টাকার প্রকল্প। ভাঙা গার্ডার জোড়া লাগানো মানে সাধারণ মানুষের জীবনের সঙ্গে বেপরোয়া জুয়া খেলা। নতুন করে পূর্ণাঙ্গ ঢালাই ছাড়া ভবিষ্যতে বড় দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে।”

এ বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রজেক্ট ম্যানেজার আনিসুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে এলজিইডি অফিসের প্রকৌশলীরা ভালো জানেন। তিনি নিজে কিছু জানেন না বলে ফোন কেটে দেন।

প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে থাকা এলজিইডির প্রকৌশলী আল আমিন বলেন, কাজের ক্ষেত্রে সবসময় ত্রুটি হয় না, তবে মাঝে মাঝে কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। তিনি স্বীকার করেন, গার্ডারটি ভেঙে গিয়েছিল, তবে তা পুনরায় মেরামত করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে বহু ঢালাইয়ের কাজ তদারকি করেছেন।

কক্সবাজার সদর উপজেলার নির্বাহী প্রকৌশলী আল মুইয়িন শাহরিয়ার বলেন, প্রকল্পটি নিয়মিত তদারকির মধ্যেই বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সাল পর্যন্ত থাকলেও পরে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ২০২৫ সালের শেষেও কাজ শেষ না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, প্রকল্পটির মেয়াদ পুনরায় বাড়ানো হয়েছে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url