সংগ্রাম থেকে সেবায়, রমজানে ইফতার নিয়ে মানুষের পাশে তরুণ সমাজ সেবক মিজান 

 


বিশেষ প্রতিবেদক : 

সূর্য ডোবার ঠিক আগের সময়। পূর্ব লারপাড়ার সরু গলিগুলোতে তখন ইফতারের ব্যস্ততা। এমন সময় কয়েকটি দরজায় কড়া নাড়ে এক তরুণ। হাতে ছোট ছোট ইফতারের প্যাকেট। দরজা খুলতেই হাসিমুখে এগিয়ে দেন খেজুর, ফল আর প্রয়োজনীয় খাবার। অনেকের জন্য আবার আলাদা করে রাখা থাকে সেহেরের সামগ্রীও।

এলাকার মানুষ তাকে চেনেন মিজানুর রহমান নামে। তবে অধিকাংশের মুখেই আরেকটি নাম “গরিবের ভাইজান”।

এস কে গেস্ট হাউজের স্বত্বাধিকারী এই তরুণ উদ্যোক্তা চলতি রমজানে প্রতিদিনই ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডসহ আশপাশের এলাকায় অসচ্ছল মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দিচ্ছেন ইফতার সামগ্রী। শুধু ইফতারই নয়, অনেক পরিবারের জন্য সেহের বাজার ও ঈদ বাজারের প্রয়োজনীয় জিনিসও তুলে দিচ্ছেন নীরবে।

মিজানের জীবনকথা শুরু হয়েছে সংগ্রাম দিয়ে। অল্প বয়সেই সংসারের হাল ধরতে হয় তাকে। কখনও চালক, কখনও ছোটখাটো ব্যবসা, আবার কখনো গাড়ির গ্যারেজে এভাবেই জীবনের কঠিন বাস্তবতার ভেতর দিয়ে বড় হয়েছেন তিনি।

পরে নিজের চেষ্টায় একটি ছোট ব্যবসা শুরু করেন। ধীরে ধীরে ব্যাংক ঋণ নিয়ে বাড়ান সেই উদ্যোগের পরিধি। সময়ের সঙ্গে ঘরভাড়া, গাড়িভাড়া ও হোটেল ব্যবসা মিলিয়ে একটি স্থিতিশীল অবস্থানে পৌঁছেছেন বলে জানান তিনি।তবে এলাকার মানুষের কাছে তার পরিচয় ব্যবসায়ী হিসেবে নয়, একজন সহমর্মী মানুষ হিসেবে।

লারপাড়ার বাসিন্দা ৬০ বছর বয়সী মাজেদা খাতুন বলেন,“এই বাজারে দুবেলা ভাতের চিন্তা ছিল। মিজান ডেকে নিয়ে ইফতার সামগ্রী দিয়েছে, চিকিৎসার খরচও দিয়েছে। তাই আমরা তাকে গরিবের ভাইজান বলি।”

জেল গেইটের বাসিন্দা সৈয়দ আলম বলেন,“অনেকে দান করে, কিন্তু মিজান নিজে গিয়ে মানুষের হাতে তুলে দেয়। এই আন্তরিকতার জন্যই মানুষ তাকে ভালোবাসে।”

রমজানের বাইরেও সামাজিক কাজে নিয়মিত দেখা যায় তাকে। রাম্তাঘাটের সংস্কার কাজে সহযোগিতা, স্থানীয় মসজিদ ও মাদ্রাসার উন্নয়নে সহায়তা, এতিম শিশুদের পড়ালেখার দায়িত্ব নেওয়া কিংবা অসচ্ছল পরিবারের মেয়েদের বিয়েতে সহযোগিতা এসব কাজের মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠেছেন মিজান।

নিজের উদ্যোগের বিষয়ে তিনি বলেন,“ছোটবেলায় কষ্ট করেছি, তাই অভাবের কষ্টটা বুঝি। ব্যবসা থেকে যে আয় হয়, তার একটি অংশ মানুষের জন্য ব্যয় করার চেষ্টা করি। এতে আলাদা কোনো কৃতিত্ব দেখি না, এটা আমার দায়িত্ব মনে করি।” এলাকার মানুষের অনুরোধেই এবার ঝিলংজা ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডে সদস্য পদে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। শুরুতে রাজি না হলেও সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অনুরোধে শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেন বলে জানান।

মিজান বলেন, “মানুষ যদি দায়িত্ব দেয়, তাহলে শুধু সহায়তা নয়, এলাকার পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির উদ্যোগ নেব।”নির্বাচন ঘিরে তার নাম এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনায়। সমর্থন যেমন বাড়ছে, তেমনি সমালোচনাও রয়েছে।

তবে পূর্ব লারপাড়ার অনেকের চোখে বিষয়টি খুবই সরল। তাদের মতে, ইফতারের সময় যে মানুষটি দরজায় কড়া নাড়ে, তার হাতে শুধু খাবারের প্যাকেট থাকে না থাকে মানুষের পাশে থাকার এক নীরব অঙ্গীকারও।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url