সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকিটে কালোবাজারি সিন্ডিকেট
![]() |
| অনলাইনে মিলছে না টিকিট, ঘাটে অতিরিক্ত দামে দালালের হাতে |
সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকিট এখন সাধারণ পর্যটকদের নাগালের বাইরে চলে গেছে। অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সব টিকিট শেষ হয়ে যাচ্ছে। অথচ সরেজমিনে ঘাটে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, সেই টিকিটই ঘুরছে দালাল ও কালোবাজারিদের হাতে অতিরিক্ত দামে।
ঘাট ও টিকিট কাউন্টার ঘুরে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকিট ঘিরে গড়ে উঠেছে একটি সংঘবদ্ধ কালোবাজারি সিন্ডিকেট। আধুনিক প্রযুক্তি ও ভুয়া তথ্য ব্যবহার করে অনলাইনে একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ টিকিট কিনে নিচ্ছে এই চক্র। পরে সেই টিকিট পর্যটকদের কাছে বিক্রি করা হচ্ছে বাড়তি দামে। এতে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে তারা।
অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে সাধারণ যাত্রীদের বারবার ‘ট্রাভেল পাস লিমিট এক্সিডেড’ বার্তার মুখে পড়তে হচ্ছে। বাস্তবে টিকিট আছে কি না, তা যাচাই করতে অনুমোদিত ওয়েবসাইট থেকে একাধিকবার টিকিট কেনার চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি। অনুমোদিত কাউন্টারগুলোতেও সরাসরি টিকিট মিলছে না। তবে কয়েকটি কাউন্টারে এমন কিছু টিকিট পাওয়া গেছে, যেগুলো কালোবাজারি চক্রের হাত ঘুরে এসেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, অনেক টিকিটে যাত্রীর নামের সঙ্গে প্রকৃত ভ্রমণকারীর কোনো মিল নেই। এক ব্যক্তির নামে কাটা টিকিট ব্যবহার করছেন অন্য ব্যক্তি—যা স্পষ্ট অনিয়মের প্রমাণ।
টিকিট কাউন্টার মালিক নুরুল আজিম বলেন, “অনলাইন ওপেন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চক্রটি টিকিট কিনে নেয়। অনুমোদিত অপারেটরদের জন্য যে ১০ শতাংশ সুবিধা থাকে, সেটিও তারা ব্যবহার করছে। ফলে ৪ হাজার টাকার টিকিট আমাদের কিনতে হয় সাড়ে ৪ হাজার টাকায়। শেষ পর্যন্ত পর্যটকদের আরও বেশি টাকা গুনতে হয়। এতে সাধারণ যাত্রীরা যেমন প্রতারিত হচ্ছেন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি আমরা বৈধ ব্যবসায়ীরাও।”
সরেজমিনে গভীর রাতে বিআইডব্লিউটিএর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, চট্টগ্রামসহ দূরদূরান্ত থেকে আসা বহু যাত্রী টিকিট না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন। দালালদের কাছে গেলেই একই টিকিট মিলছে অতিরিক্ত দামে।
চট্টগ্রাম থেকে আসা পর্যটক কুতুবি বলেন, “১০–১৫ দিন আগে যারা টিকিট কেটেছে, তারাই যেতে পারছে। আমরা শেষ মুহূর্তে এসে কিছুই পাচ্ছি না। দালালের কাছে গেলে বাড়তি টাকা চাইছে।”
ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সেলিম নেওয়াজ বলেন, “কক্সবাজারে এসে টিকিট পাব—এই আশায় ছিলাম। এখন এসে বিপদে পড়েছি। ঘাটে একজন দুইটা টিকিট দিতে চেয়েছে, দাম বলেছে ৪ হাজার ৫০০ টাকা। অথচ অনলাইনে দাম ৪ হাজার।”
এদিকে গোপনে ধারণ করা কয়েকটি ভিডিও রেকর্ড প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। সেখানে ইউনুস নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে টিকিট কেনাবেচার কথোপকথন শোনা যায়। ভিডিওতে তিনি একটি টিকিটের দাম ৪ হাজার ৫০০ টাকা উল্লেখ করেন এবং প্রয়োজনে আরও টিকিট সংগ্রহ করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। অনুসন্ধানে আপন ও নিসাত নামের আরও কয়েকজনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে ফোনে যোগাযোগ করা হলে নিসাত অভিযোগ অস্বীকার করেন।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ সি ক্রুজ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, “কালোবাজারির সঙ্গে কোনো এজেন্ট বা শিপের কর্মকর্তা জড়িত থাকলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
অতিরিক্ত ডিআইজি আপেল মাহমুদ বলেন, “কালোবাজারির বিরুদ্ধে ট্যুরিস্ট পুলিশ গোয়েন্দা নজরদারিতে রেখেছে। এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে জাহাজ মালিকদের আরও সতর্ক থাকতে হবে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, সেন্টমার্টিনগামী জাহাজের টিকিটে এভাবে গড়ে ওঠা কালোবাজারি সিন্ডিকেট শুধু পর্যটকদের নয়, পুরো পর্যটন শিল্পের জন্যই বড় হুমকি। দ্রুত স্বচ্ছতা নিশ্চিত না হলে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি কমার কোনো লক্ষণ নেই।
