জিয়াউর রহমান সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সৎ শাসক
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের জাতীয় ইতিহাসের এক অবিস্মরণীয় নাম। তিনি আমাদের জাতিসত্তার রূপকার। মহান স্বাধীনতার ঘোষক। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক।
আধুনিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশের স্থপতি। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠাতা। মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার।
জিয়া স্বাধীনতাযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর প্রথম সামরিক ব্রিগেড ‘জেড’ ফোর্সের অধিনায়ক। দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলে পারস্পরিক সহযোগিতামূলক শীর্ষ সংগঠন সার্কের স্বপ্নদ্রষ্টা। একজন ভিশনারি, সার্থক ও কীর্তিমান রাষ্ট্রনায়ক। স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রতীক।
সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সৎ শাসক। ঘোরতর বিরোধীরাও তাঁর বিরুদ্ধে অনিয়ম, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ আনতে পারেননি।
জিয়াউর রহমানকে যে বিশেষণেই বিশেষায়িত করা হোক না কেন, তাতে তাঁর যোগ্যতার পূর্ণ প্রকাশ ঘটে না, কারণ তাঁর কীর্তি বাস্তবিকই বিপুল ও বিশাল। জাতির প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে তিনি বারবার দাঁড়িয়েছেন নির্ভয়ে মাথা উঁচু করে। অসীম সাহসিকতা, দূরদর্শিতা, প্রজ্ঞা ও দেশপ্রেম নিয়ে তিনি সময়ের প্রয়োজনে আলোর দ্যুতি নিয়ে এগিয়ে এসেছেন।
বিপর্যস্ত জাতিকে রক্ষা করেছেন সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে।
আমাদের অহংকার অধ্যায়কে তিনি আলোকিত ও সমৃদ্ধ করেছেন। অল্প জীবনে বিশাল তাঁর অর্জন। মাত্র ৪৫ বছর বয়সে তিনি কর্মগুণে জ্যোতির্ময় হতে পেরেছিলেন, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের অনেক কীর্তির মধ্যে আমার মতে তার অমর কীর্তি ৫টি। যা জিয়াকে অনন্তকাল বাঁচিয়ে রাখবে। এগুলো হচ্ছে—
ক) স্বাধীনতার ঘোষণা,
খ) ১৯৭৫ সালে সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা,
গ) বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা,
ঘ) বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন ও
ঙ) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গঠন।
স্বাধীনতার ঘোষণা : জাতিগতভাবে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। এই স্বাধীনতার ইতিহাসে সোনালি হরফে লেখা আছে জিয়াউর রহমানের নাম। ২৫ মার্চ কালরাতে অকস্মাৎ গর্জে উঠল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতিয়ার। নিরস্ত্র, নিরপরাধ ঘুমন্ত জাতির ওপর হিংস্র বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ল তারা। বেঘোরে প্রাণ হারাল অগণিত মানুষ। রাজনৈতিক নেতৃত্বহীন, অপ্রস্তুত, অসংগঠিত জাতি যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ়, ঠিক সেই মুহূর্তে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে ভেসে এলো একটি বজ্রকণ্ঠ—‘আমি মেজর জিয়া বলছি’। তার এ ঘোষণা জাতিকে উজ্জীবিত করেছিল।
রাজনৈতিক নেতৃত্ব যখন ব্যর্থ, সৈনিক জিয়া তখন হাল ধরলেন। আশাহত শঙ্কিত জাতিকে আশাজাগানিয়া গান শোনালেন; তিনি ঘোষণা করলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা। জিয়া অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে বাঙালি সৈন্যদের একত্রিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। সেনাবাহিনীর সবাইকে একত্রিত করে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা জিয়াই করেছিলেন। স্বাধীনতা ঘোষণার পরপরই চট্টগ্রামে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। সব ক্যান্টনমেন্টে তিনি যোগাযোগ স্থাপন করেন। বাঙালি সেনাদের যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে উদ্বুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে জিয়া যেভাবে চিন্তা করতেন, সেটা অন্যরা করেননি। জিয়াই প্রথম চিন্তা করলেন পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ফলপ্রসূ আঘাত হানতে হলে ‘রেগুলার ওয়েল ট্রেন্ড আর্মি’ দরকার। সে লক্ষ্যে তিনি ব্রিগেড গঠনের সিদ্ধান্ত নিলেন। ভারতীয়রা প্রথমে রাজি হননি। জিয়াউর রহমান তা অগ্রাহ্য করে এবং প্রথম ব্রিগেড গঠন করেন, সেটির নামকরণ করা হয়েছিল তাঁর নামের আদ্যক্ষর দিয়ে ‘জেড ফোর্স’। এটি ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ ও শক্তিশালী ব্রিগেড। ‘জেড’ ফোর্সের যোদ্ধারা রণাঙ্গনে অনেক গৌরবদীপ্ত ভূমিকা রেখেছেন। এই ফোর্স স্বাধীনতাযুদ্ধে সবচেয়ে বেশি সাহসিকতার পদক অর্জন করে। আত্মদান ও শহীদের সংখ্যাও বেশি ছিল এই ফোর্সে। মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়াউর রহমান বিখ্যাত সব যুদ্ধের নির্দেশনা ও পরিকল্পনা করেছিলেন। কামালপুরের প্রথম যুদ্ধ, বিলোনিয়ার যুদ্ধ, নকশী বিওপির যুদ্ধ, বাহাদুরাবাদ যুদ্ধ, দেওয়ানগঞ্জ থানা আক্রমণ, চিলমারী উভচর অভিযান, হাজীপাড়া, ছোট খাল, গোয়াইনঘাট, টেংরাটিলা, গোবিন্দগঞ্জ, সালুটিকর বিমানবন্দর, ধলাই চা-বাগান, ধামাই চা-বাগান, জকিগঞ্জ, আলি-ময়দান, এমসি কলেজের যুদ্ধ, ভানুগাছ যুদ্ধ, কানাইঘাট যুদ্ধ, বয়মপুর যুদ্ধ, ফুলতলা চা-বাগান যুদ্ধসহ অসংখ্য যুদ্ধ মেজর জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও পরিকল্পনায় হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধে উত্তরাঞ্চলের স্বাধীন অঞ্চলগুলো নিরাপদ রাখা ছিল জিয়াউর রহমান ও তার অধীনে গঠিত ‘জেড’ ফোর্সের অন্যতম প্রধান কাজ। এর অংশ হিসেবে জিয়াউর রহমানের নির্দেশে ও পরিকল্পনায় জেড ফোর্স বেশ কয়েকটি অঞ্চল স্বাধীন করে প্রশিক্ষণকেন্দ্র গড়ে তোলে।
মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে জিয়ার নেতৃত্বে যুদ্ধকে ‘স্টালিনগ্রাদের’ যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করেন। তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭১ সালে ১১ এপ্রিল জাতির উদ্দেশে যে ভাষণ দিয়েছিলেন তাতে বলেন, “চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমানবাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যূহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলার ভাই-বোনেরা যে সাহসিকতার সঙ্গে শত্রুর মোকাবেলা করছেন, স্বাধীনতাসংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্টালিনগ্রাদের পাশে স্থান পাবে। চট্টগ্রাম ও সম্পূর্ণ নোয়াখালীকে মুক্ত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।”
জাতীয়তার পরিচয় প্রদান : বিশাল এক শূন্যতার মাঝে জিয়াউর রহমান জাতীয় রাজনীতির হাল ধরেন। স্বপ্নহীন ও হতাশ একটি জাতির চোখের তারায় তারায় তিনি ছড়িয়ে দেন শান্তি, উন্নতি ও সমৃদ্ধির স্বপ্ন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি ঐক্যবদ্ধ জাতির নিরলস প্রচেষ্টা ও কঠোর শ্রম সে জাতিকে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারে। এ উদ্দেশ্যে সর্বাগ্রে তিনি আমাদের জাতিসত্তার সঠিক ঠিকানা নির্ণয় করেন। তিনিই প্রথম উচ্চারণ করেন আমরা বাংলাদেশি, বাঙালি নই। বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ হবে আমাদের দর্শন। জিয়া বললেন, “ধর্মের দিক থেকে আমরা কেউ মুসলিম, কেউ হিন্দু, কেউ বৌদ্ধ কিংবা খ্রিস্টান, আমরা যা-ই হই না কেন, পাহাড় বা সমতলের যেখানেই আমাদের আবাসভূমি হোক না কেন, এই দেশের মানচিত্র, ইতিহাস, ভূগোল, অর্থনীতি, ভাষাযুদ্ধ এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আমাদের সবাইকে একটি জাতিত্বের সূত্রে বেঁধেছে, আমরা চিরকাল এক জাতি হয়ে থাকব—আমরা বাংলাদেশি।”
বাংলাদেশের প্রথম সংবিধানে শেখ মুজিবুর রহমান পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়িদের (উপজাতি) বাঙালি হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এটা মানতে রাজি ছিলেন না পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিরা। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি এক বুক আশা বেঁধে চাকমা রাজার প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করেন। মানবেন্দ্র লারমার নেতৃত্বে ১২ জনের একটি প্রতিনিধি শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি স্মারকলিপি দিতে চান। স্মারকলিপিটি মানবেন্দ্র লারমার হাতেই ছিল। শেখ মুজিবুর রহমান জানতে চান, এতে কী লেখা আছে। লারমা এটি পড়ে শোনান। শেখ মুজিবুর স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেননি। উল্টো তিনি উপজাতিদের দাবিগুলো নাকচ করে দিয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা সবাই বাঙালি। তোমাদের নৃতাত্ত্বিক পরিচয় ভুলে যাও, বাঙালি হয়ে যাও।’ প্রধানমন্ত্রী তাদের ধমক দিয়ে বলেন যে ‘যদি তারা তাদের দাবিতে অনড় থাকে, তাহলে তিনি বাঙালি ঢুকিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভাসিয়ে দেবেন। (সূত্র : পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যা মনজুর খুন : মহিউদ্দিন আহমদ)
এদিকে, ৩১ অক্টোবর (৭২) গণপরিষদ অধিবেশনে আওয়ামী লীগের দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রাজ্জাক ভূঁইয়া সংবিধান বিলের ৬ অনুচ্ছেদের পরিবর্তে ‘বাংলাদেশের নাগরিকত্ব আইনের দ্বারা নির্ধারিত ও নিয়ন্ত্রিত হইবে। বাংলাদেশের নাগরিকরা বাঙালি বলিয়া পরিচিত হইবেন’, এই অনুচ্ছেদটি সন্নিবেশ করার প্রস্তাব আনেন। সংসদ সদস্য আবদুর রাজ্জাকের এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন লারমা। তিনি সংসদে বলেন, ‘বাংলাদেশের সঙ্গে আমরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। কিন্তু আমি একজন চাকমা। আমার বাপ-দাদা, চৌদ্দপুরুষ কেউ বলে নাই আমি বাঙালি। আমরা কোনো দিনই নিজেদের বাঙালি মনে করি নাই। আজ যদি এ সংশোধনী পাস হয়, তাহলে আমাদের এই চাকমা জাতির অস্তিত্ব লোপ পাবে। আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। আমরা আমাদের বাংলাদেশি বলে মনে করি এবং বিশ্বাস করি। কিন্তু বাঙালি বলে নয়।’ এরপর স্পিকার আবদুর রাজ্জাকের সংশোধনী প্রস্তাবটি কণ্ঠভোটে দেন এবং তা পাস হয়। (সূত্র : পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিবাহিনী জিয়া হত্যার মনজুর খুন : মহিউদ্দিন আহমদ)
১৯৭৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাঙামাটিতে এক জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান উপজাতিদের উদ্দেশে প্রশ্ন রাখেন কেন তারা বাঙালি হতে পারবে না? প্রধানমন্ত্রীর এমন হুংকারের পর পার্বত্যবাসীর উপলব্ধি হতে থাকে যে নিজেদের পথ নিজেদের বেছে নিতে হবে। এ লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে জনসংহতি সমিতি তাদের শান্তিবাহিনীর সামরিক শাখা গঠন করে। এর পর থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে অশান্তি শুরু হয়।
জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ১৯৭৯ সালে ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ প্রবর্তন করেন। দেশের মানুষ সঠিক জাতিসত্তার পরিচয় ফিরে পায়। তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরির্বতে ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’ প্রবর্তন করায় উপজাতিদের দীর্ঘদিনের দাবি যেমন বাস্তবায়ন হয়, তেমনি উপজাতিরা দেশের মালিকানা ফিরে পান।
বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রবর্তন : শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭৫ সালে দেশের সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করে গণবিমুখ একদলীয় বাকশালীব্যবস্থা চালু করেন। সেদিনগুলোতে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, বাকস্বাধীনতা, রাজনৈতিক মতপ্রকাশের কোনো স্বাধীনতা ছিল না। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধ করা হয়। একদল, এক ব্যক্তিশাসনে গোটা দেশ এক জিন্দানখানায় (বন্দিশালা) পরিণত হয়েছিল। জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্রের দরজা উন্মুক্ত করে দেন। তিনি উপলব্ধি করেন যে গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে অবশ্যই মত ও পথের শতফুল ফুটতে দিতে হবে। এই লক্ষ্য ও মানসেই তিনি ১৯৭৬ সালে ‘রাজনৈতিক দল বিধি ১৯৭৬’ জারি করেন। এর ফলে দেশে সব রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবনের সুযোগ ঘটে। এ প্রক্রিয়ায় ১৯৭৬ সালে ৪ নভেম্বর বৈধ রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ স্বীকৃতি লাভ করে। একইভাবে ১৯৭৯ সালের ৬ এপ্রিল পঞ্চম সংশোধনী কার্যকর হলে দেশে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা চালু হয়।
স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা : ১৯৭৫ সালে শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করার পর ক্ষমতায় আসে তৎকালীন আওয়ামী লীগের অন্যতম শীর্ষ নেতা খন্দকার মোশতাকের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি গ্রুপ। সেনাবাহিনীর একাংশ মোশতাক সরকারকে সমর্থন দেয়, আরেকটি অংশ বিরোধিতা করতে থাকে। সমগ্র জাতি তখন চরম সংকটের মুখোমুখি। তৎকালীন সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর কিছু সদস্য বিদ্রোহ করেন। খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ৩ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে বন্দি করেন। রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাককে পদচ্যুত করা হয় ও বিচারপতি আবু সাদাত মো. সায়েমকে রাষ্ট্রপতি করা হয়।
১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর জিয়াউর রহমান বন্দি হওয়ার পর সেনাবাহিনীতে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দেয়। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান ও দেশপ্রেমের কারণে জিয়া ইতিমধ্যে সেনাবাহিনী ও জনগণের হৃদয়ে আসন গড়ে নেন। এ সময় বিভিন্ন ঘটনাপ্রবাহের কারণে সেনাবাহিনীতে দেখা দেয় চরম বিশৃঙ্খলা। দেশের জনগণ দুঃসহ অনিশ্চিত পরিস্থিতির কারণে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির সম্মুখীন, ঠিক সেই মুহূর্তে সশস্ত্র বাহিনী-জনতার সমন্বয়ে ৭ নভেম্বর ঐতিহাসিক সিপাহি বিপ্লব ঘটে। বন্দিদশা থেকে মুক্ত করা হয় জাতির সবচেয়ে বিশ্বস্ত সন্তান জিয়াউর রহমানকে। সবাই বুঝলেন, জাতির এ ক্রান্তিকালে জিয়া ছাড়া আর কারো কাছে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিরাপদ নয়। তাই তারা জিয়াকে শুধু মুক্তই করেননি; তাঁকে নিয়ে আসেন ক্ষমতার শীর্ষ বিন্দুতে। ঐক্যবদ্ধ সিপাহি-জনতার বিপ্লবের মধ্য দিয়ে তিনি এ দেশের রাজনীতিতে আবির্ভূত হন। ফিরিয়ে আনেন সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা। সব ষড়যন্ত্রের জাল ভেদ করে নিরাপদ করেন দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব। এরপর ঘটনার আবর্তে তিনি বাংলাদেশের রাজনীতির আকাশে আবির্ভূত হন।
বিএনপি জিয়ার অনন্য সৃষ্টি : বিএনপি শহীদ জিয়ার এক অনন্য সৃষ্টি। সব বাধা-বিঘ্ন অতিক্রম করে বিএনপি পৌঁছে গেছে সাফল্যের শীর্ষতম বিন্দুতে। বিএনপি, জিয়া ও বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে এক ও অভিন্ন সত্তায়। দেশের এক ক্রান্তিকালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল গঠন করেন। যখন আধিপত্যবাদী শক্তি দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব খর্ব করতে তৎপর ছিল। যখন দেশের তৎকালীন ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী স্বাধীনতাত্তোর তাদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় কর্তৃত্বমূলক শাসন জারি করে মানুষের বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার কেড়ে নেয়। যখন হত্যা ও খুনের রাজনীতি জাতীয় জীবনের অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়ায়। মানুষের জীবন ও নিরাপত্তা যখন চরমভাবে বিপন্ন ঠিক সেই অরাজক সময়ে বিএনপির জন্ম। অর্জিত স্বাধীনতাকে আর কেউ যাতে বিপন্ন করতে না পারে, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে যেন কোনো অপশক্তি ধ্বংস করতে না পারে, সেই দৃঢ়প্রত্যয় নিয়েই শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর শাসনামলে সামাজিক সুবিচার ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির কারণে দেশের উন্নয়ন ও অগ্রগতি আন্তর্জাতিক মর্যাদা লাভ করে। দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষপীড়িত দেশ ইমার্জিন টাইগারে পরিণত হয়। তিনি বিএনপিকে গণতন্ত্র, উন্নয়ন, উৎপাদন ও জাতীয় স্বার্থরক্ষার উপযুক্ত করে গড়ে তোলেন। নেতাপূজা, তোষামোদি ও স্লোগাননির্ভর বিদ্যমান রাজনীতির পরিবর্তে তিনি উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি চালু করেন। দলের নেতাকর্মী ও জনগণকে তিনি সম্পৃক্ত করেন খাল খনন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ অভিযান, রাস্তাঘাট নির্মাণ প্রভৃতি উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে। অলস পড়ে থাকা কলকারখানাগুলোতে আবার কাজ শুরু হয়। এমনকি কোনো কোনো কারখানায় দুই শিফটেও কাজ চলে। জিয়া রাজনীতিকে প্রাসাদ বন্দি না করে ছড়িয়ে দেন সারা দেশ। জিয়ার প্রতি জনগণের ভালোবাসার কারণে বিএনপি শুরু থেকেই জনপ্রিয়তা পায়। পরবর্তীতে বিএনপি গণমুখী কর্মকাণ্ডের কারণে দলটি মানুষের আস্থা অর্জন করতে সক্ষম হয়। তাই জনগণ যখনই ভোট দিয়ে সরকার গঠনের সুযোগ পেয়েছে, তখনই বিএনপিকে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনেছে।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ দলটি দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও গণতন্ত্র রক্ষার অতন্ত্র প্রহরী হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে। মুক্তিযুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন এই দলের প্রতিষ্ঠাতা। জাতিসত্ত্বার পরিচয়ও এনে দিয়েছেন তিনি। ‘৭৫ সালে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব যখন হুমকির মুখে পড়ে তখন তা রক্ষা করেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান। জিয়াউর রহমানকে হত্যার পর স্বৈরশাসন কায়েম হলে বিএনপি একটানা ৯ বছর সংগ্রাম করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করে। গণতন্ত্রের এ লড়াইয়ে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীকে জীবন দিতে হয়। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন চক্র অগণতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা দখলে নিলে বিএনপি গণতন্ত্রের জন্য আবারও সংগ্রামে লিপ্ত হয়। জেলে যেতে হয় বিএনপির চেয়ারপারসন দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াসহ দলের অসংখ্য নেতাকর্মীকে। দলের তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমানের ওপর পাশবিক নির্যাতন চালিয়ে তাঁর মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়া হয়। আরাফাত রহমান কোকো অমানবিক নির্যাতনে অসুস্থ হয়ে শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান মালয়েশিয়ায়। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিন চক্রের সহযোগিতায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতা দখল করে গত ১৫ বছর ধরে দেশে ফ্যাসিবাদী শাসন কায়েম করেছে। গণতন্ত্র, ভোটের অধিকার ও মানবাধিকারের দাবিতে এ দলটি শত নির্যাতনের মধ্যেও আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে। এ আন্দোলনে বিএনপির অসংখ্য নেতাকর্মীকে জীবন দিতে হয়, গুম হতে হয়। বিএনপির ৪৫ লাখ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া হয়েছে। কোনো নেতার বিরুদ্ধে ৪০০ আবার কোনো নেতার বিরুদ্ধে ৩০০টি পর্যন্ত মামলা দেওয়া হয়েছে। গুম হয়েছেন প্রায় ৭০০ তরুণ-যুবক, তার মধ্যে তিনজন সংসদ সদস্য ছিলেন। বিএনপির অনেক জনপ্রিয় নেতাকে নির্বাচনের পূর্বে ফরমায়েশি সাজা দেয় তারা যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলা দিয়ে বছরের পর বছর বন্দি করে রাখা হয়েছে। অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশ পর্যন্ত যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা ও সাজা দিচ্ছে। তাঁকে দেশে আসতে দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি তাঁর বক্তব্য প্রচার করতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রবীণ ও মার্জিত রাজনীতিক, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বিরুদ্ধে অসখ্য মামলা। কিছুদিন পর পর তাঁকে জেলে বন্দি রাখা হয়। এত নির্যাতনের পরও থেমে নেই বিএনপি। গণতন্ত্রের জন্য তাদের লড়াই চলছে অবিরাম। এখানেই বিএনপি প্রতিষ্ঠার স্বার্থকতা।
শান্তি প্রতিষ্ঠা ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা : শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণের আগে এই গোটা বাংলাদেশ পরিণত হয় নরককুণ্ডে। রক্ষীবাহিনী গুম, খুন অপহরণ, অত্যাচার, নির্যাতন-লুটপাট ও ধর্ষণ চালিয়ে গোটা দেশকে মনুষ্য বসবাসে অযোগ্য করে তুলেছিল। বাকশাল গঠনের পর রক্ষীবাহিনীর নিষ্ঠুরতা সব সীমা ছাড়িয়ে যায়। ভিন্নমতের তরুণদের ধরে নিয়ে তারা নির্মমভাবে হত্যা করত। দিনে বা রাতে তাদের ধরে নিয়ে যেত আর পরের দিন তাদের লাশ ভাসত নদী, খাল, বিলে। মুক্তিযোদ্ধারাও তাদের হাত থেকে রেহাই পাননি। যুবতী মেয়েদের ধরে নিয়ে ধর্ষণ করত। অনেক পরিবার তাদের মেয়েদের স্কুল-কলেজে পাঠানো বন্ধ করে দিয়েছিল। এই রক্ষীবাহিনী মারাঠা বর্গীদের মতো মানুষের ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিত, সম্পদ লুট করত। এমনিভাবে তারা এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি তৈরি করে।
এই সময় দৈনিক বাংলার সহকারী সম্পাদক নির্মল সেন (অনিকেত) মার্চের নির্বাচনের কয়েক দিন পরে ‘আমি স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চাই’ শীর্ষক একটি উপসম্পাদকীয় লিখেছিলেন। এই উপসম্পাদকীয়তে এক সপ্তাহের একটি ঠিকুজি তুলে ধরেন ১৩টি হত্যাকাণ্ডের। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন যে, এ খবর সব খবর নয়। সব খবর সংবাদপত্রে পৌঁছে না। সব খবর পৌঁছে না থানায়। দূর-দূরান্ত থেকে কে দেয় কার খবর? আর দিতে গেলে জীবনের যে ঝুঁকি আছে সে ঝুঁকি নিতেই বা কতজন রাজি?
রক্ষীবাহিনীর নৃশংসতা কত ভয়াবহ ছিল তার একটি ঘটনা শুনুন। সাংবাদিক ও কলামিস্ট আহমেদ মুসার ঐতিহাসিক দলিল ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের সূচনা পর্ব : ইতিহাসের কাঠগড়ায় আওয়ামী লীগ’ বইয়ে এই ঘটনাটি উল্লেখ রয়েছে। বাজিতপুরের নিরীহ কৃষক আবদুল আলী রক্ষীবাহিনী কর্তৃক তার সন্তান হত্যার নৃশংসতা তুলে ধরে বলেন, “আমার সামনে ছেলেকে গুলি করে হত্যা করল। আমার হাতে কুঠার দিয়ে বলল, ‘মাথা কেটে দে, ফুটবল খেলব।’ আমি কি তা পারি! আমি যে বাপ। কিন্তু অকথ্য নির্যাতন কতক্ষণ আর সহ্য করা যায়। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত নিজের হাতে ছেলের মাথা কেটে দিয়েছি। রশীদ নাকি রাজনীতি করত আমি জানতাম না। একদিন মাতু আর শাহজাহান এসে ধরে নিয়ে গেল। আওয়ামী লীগ অফিসে সারা রাত ওরা ওকে বেদম মার মারল। সকালে বলল এক হাজার টাকা দিলে ছেড়ে দেবে। রশীদ স্বীকার করে এল এক হাজার টাকা দেবার। আমার কাছে টাকা চাইল। কিন্তু আমি দিন আনি দিন খাই, মজুর মানুষ। হঠাৎ তিন দিনের মধ্যে এক হাজার টাকা কোত্থেকে দেব? বললাম, তুই বরং পালিয়ে সিলেট চলে যা। রশীদ সিলেট চলে গেল। কিন্তু ১০-১২ দিন পর ফিরে এসে বলল, ‘বাবা মন মানে না তোমাদের ফেলে থাকতে।’ সিলেট থেকে ফেরার পরই কঠিন অসুখে পড়ল। টাইফয়েড। অসুখ সারার পর একদিন তার মাকে বলল, ‘মা আজ ভাত খাব।’ তার মা শৈল মাছ দিয়ে তরকারি রাঁনল। এমন সময় আওয়ামী লীগের পাণ্ডারা রক্ষীবাহিনীসহ বাড়ি ঘেরাও করল। অসুস্থ মানুষ। কোনো রকমে বাড়ি থেকে বের হয়ে মাঠের দিকে দৌড় দিল। বাবা আমার জানত না সেখানেও ঘাপটি মেরে বসে আছে আজরাইল। পাষণ্ডরা দৌড়ে এসে ধরল তাকে। রশীদ সিরাজের পা ধরে বলল, ‘সিরাজ ভাই, বিমারী মানুষ আমায় ছেড়ে দেন।’ ছাড়ল না। তারপর বাপ-বেটা দুজনকেই বেঁধে মার শুরু করল। কত হাতে-পায়ে ধরলাম। এরপর মাতু গুলি করল রশীদকে। ঢলে পড়ল রশীদ। আমি নির্বাক তাকিয়ে রইলাম। মরার পর একজন বলল, ‘চল ওর কল্লাটা নিয়ে যাই ফুটবল খেলব।’ মাতু বলল, ‘হ্যাঁ। তাই নেব। তবে ওর কল্লা আমরা কাটব না। তার বাবা কেটে দেবে।’ বলেই আমার হাতে কুঠার দিয়ে বলল কেটে দিতে। আমার মুখে রা নেই। বলে কী পাষণ্ডগুলো? চুপ করে আছি দেখে বেদম পেটাতে শুরু করল। বুড়ো মানুষ কতক্ষণ আর সহ্য হয়। সিরাজ এসে বুকে বন্দুক ঠেকিয়ে বলল, ‘এক্ষুনি কাট, নইলে তোকেও গুলি করব।’ ইতিমধ্যে দেড় ঘণ্টার মতো সময় পার হয়ে গেছে। বুঝতে পারলাম না কাটলে ওরা সত্যি আমাকেও মেরে ফেলবে কি না? শেষে কুঠার দিয়ে কেটে দিলাম মাথা। নিয়ে উল্লাসে চলে গেল তারা। আল্লায় কি সহ্য করব? এ রকম হাজারো ঘটনা সে সময় ঘটেছে।”
রক্ষীবাহিনীর আরেকটি নির্মতার কথা শোনাই। ‘৭৩ সালের প্রারম্ভ থেকেই গ্রামে গ্রামে চলে রক্ষীবাহিনীর বর্বর, নিষ্ঠুর ও পৈশাচিক অভিযান। মুজিব আমলে রক্ষীবাহিনীর নির্যাতনের একটি দলিল আত্মগোপনকারী কমিউনিস্ট নেতা শান্তিসেনের স্ত্রী শ্রীমতি অরুণা সেনের বিবৃতি। অরুনা সেন, রানী সিংহ ও হনুফা বেগমকে ফরিদপুর জেলার মাদারীপুর মহকুমার রামভদ্রপুর গ্রাম থেকে রক্ষীবাহিনী ধরে নিয়ে যায়।
মুক্তি পাওয়ার পর আওয়ামী লীগ সরকারের অন্যায়-নির্যাতনের স্বরূপ প্রকাশের জন্য শ্রীমতি অরুণা সেন সংবাদপত্রে একটি বিবৃতি দেন। তিনি বলেন, “গত ৩রা ফেব্রুয়ারি ১৯৭৪ রাতে রক্ষীবাহিনী এসে সম্পূর্ণ গ্রামটিকে ঘিরে ফেলে। ভোরে আমাকে ধরে নদীর ধারে নিয়ে গেল। সেখানে দেখলাম, গ্রামের উপস্থিত প্রায় অধিকাংশ সক্ষমদেহী পুরুষ, এমনকি বালকদের পর্যন্ত এনে হাজির করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের থানা সম্পাদক হোসেন খাঁ সব কিছুর তদারকি করছে। আমার সামনে রক্ষীবাহিনী উপস্থিত সকলকে বেদম মারপিট শুরু করে। শুনলাম এদের ধরতে গিয়ে বাড়ির মেয়ে-ছেলেদেরও তারা মারধর করে এবং অনেক ক্ষেত্রে অশালীন আচরণ করেছে। এরপর আমাকে রক্ষীবাহিনীর কমান্ডার হুকুম করল পানিতে নেমে দাঁড়াতে। সেখানে নাকি আমাকে গুলি করা হবে। আমি নিজেই পানির দিকে নেমে গেলাম। ওরা রাইফেল উঁচিয়ে তাক করল গুলি করবে বলে। কিন্তু পরস্পর কী সব বলাবলি করে রাইফেল নামিয়ে নিল। আমি কাঁদা-পানিতে দাঁড়িয়েই থাকলাম। কমান্ডার গ্রেপ্তার করা সবাইকে হিন্দু-মুসলমান দুই কাতারে ভাগ করে দাঁড় করাল। মুসলমানদের উদ্দেশে বক্তৃতা দিয়ে বলল, ‘মালাউনরা আমাদের দুশমন। তাদের ক্ষমা করা হবে না। তোমরা মুসলমানরা মালাউনদের সাথে থেকো না। তোমাদের এবারের মতো মাফ করে দেওয়া হলো।’ এই বলে কলিমুদ্দিন ও মোস্তফা নামের দুজন মুসলমান যুবককে রেখে বাকি সবাইকে এক একটা বেতের বাড়ি দিয়ে বলল, ‘ছুটে পালাও’। তারা ছুটে পালিয়ে গেল। আমার পাকিস্তানি বাহিনীর কথা মনে পড়ল। তারাও বিক্ষুব্ধ জনতাকে বিভক্ত করতে এমনিভাবে সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিয়েছিল। পার্থক্য শুধু তারা ধর্মের নামে সাম্প্রদায়িকতার আশ্রয় নিত আর এই ধর্মনিরপেক্ষতার ধ্বজাধারীরা ভণ্ডামির আশ্রয় নিচ্ছে।
৬ ফেব্রুয়ারি ভোর না হতেই রক্ষীবাহিনী ঘুম থেকে আমাকে তুলল। আমাকে বাড়ির বাইরে নিয়ে এলে দেখলাম রানীও রয়েছে। আমাদের নিয়ে তারা দুই মাইল দূরে ভেদরগঞ্জ রক্ষীবাহিনীর ক্যাম্পের দিকে রওনা হলো। রাস্তায় তারা রানীর প্রতি নানা রকমের অশ্লীল উক্তি করেছিল। আমরা ক্যাম্পে আসতেই অনেক রক্ষীবাহিনী এসে আমাদের ঘিরে দাঁড়াল। কেউ অশ্লীল মন্তব্য করে, কেউ চুল ধরে টানে, কেউ চড় মারে, কেউ খোঁচা দেয়। এমন সব বর্বরতা। কিছুক্ষণ পর আমাদের রোদের মধ্যে বসিয়ে রেখে তারা চলে গেল। সন্ধ্যায় আমাকে উপরে দোতলায় নিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই শুনলাম রানীর হৃদয়বিদারি চিৎকার। প্রায় আধঘণ্টা পর আর্তনাদ স্তিমিত হয়ে থেমে গেল। নিঃস্তব্ধ রাতের অন্ধকার ভেদ করে ভেসে আসছিল বেতের সপাং সপাং শব্দ আর পাশবিক গর্জন। রানীকে যখন এনে তারা কামরার মধ্যে ফেলল, রাত্রি তখন কত, জানি না। রানীর অচেতন দেহ তখন বেতের ঘায়ে ক্ষতবিক্ষত। রক্ত ঝরছে। জ্ঞান ফিরলে রানী পানি চাইল, আমি তাকে পানি খাওয়ালাম। রানী আস্তে আস্তে কথা বলতে পারল। রাত্রি তখন ভোর হয়ে এসেছে। রানীর মুখে শুনলাম উপরে ভেদরগঞ্জ ও ডামুড্যার আওয়ামী লীগ সম্পাদকরা এবং ওই দুই স্থানের ক্যাম্প কমান্ডাররা উপস্থিত ছিল। তারা শান্তি সেন ও চঞ্চলকে ধরিয়ে দিতে বলে এবং অস্ত্র কোথায় আছে জিজ্ঞাসা করে। রানী কিছুই জানে না বলায় তাকে এমন সব অশ্লীল কথা বলে, যা কোনো সভ্য মানুষের পক্ষে বলা তো দূরের কথা, কল্পনা করাও সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ জিজ্ঞাসাবাদ ও গালি বর্ষণের পর ভেদরগঞ্জ ক্যাম্প কমান্ডার বেত নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এলোপাতাড়ি এমন পেটাতে থাকে যে তিনখানা বেত ভেঙে যায়। আবার জিজ্ঞাসা করে, শান্তি ও চঞ্চল কোথায়? রানীর একই উত্তর। ক্ষীপ্ত হয়ে রানীকে তারা সিলিংয়ের সাথে ঝুলিয়ে দেয় এবং দুই কমান্ডার এবার একই সাথে চাবুক দিয়ে পেটাতে শুরু করে। মারার সময় অসহ্য যন্ত্রণায় রানী বলেছিল, ‘আমাকে এভাবে না মেরে গুলি করে মেরে ফেলুন।’ জবাবে একজন বলে, ‘সরকারের একটা গুলির দাম আছে। তোকে সাত দিন ধরে পিটিয়ে মেরে ফেলব। এখন পর্যন্ত মারার দেখেছোটা কী?’ অল্পক্ষণ পরেই রানী অচেতন হয়ে পড়ে। কিন্তু তাদের চাবুক চালানো বন্ধ হয়নি। যখন জ্ঞান ফেরে রানী দেখে সে মেঝেতে পরে আছে। পানি চাইলে তারা তাকে পানি দেয়নি। ৮ ফেব্রুয়ারি প্রথমে আমাকে ও পরে রানীকে দোতলায় নেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ডামুড্যার আওয়ামী লীগ সেক্রেটারি ফজলু মিঞা ও ভেদরগঞ্জের সেক্রেটারি হোসেন খাঁ। তারা চেয়ারে বসে আছেন। আমাকে বললেন, তোমার স্বামী ও ছেলেকে ধরিয়ে দাও। অস্ত্র কোথায় আছে বলে দাও। তারা ডাকাত, অস্ত্র দিয়ে ডাকাতি করে। আমি বললাম, তারা ডাকাত নন। তারা সৎ দেশপ্রেমিক, আমার স্বামী রাজনীতি করেন এ কথা কে না জানে। দেশের সাধারণ লোকের অতি প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় তিনি। রানীকে তারা একই প্রশ্ন করেন। রানী কিছুই জানে না বলায় তারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। ডামুড্যা ক্যাম্পের কমান্ডার করম আলী এবং ভেদরগঞ্জ ক্যাম্প কমান্ডার ফজলুর রহমান আমাদের অশ্লীল গালাগাল দিতে শুরু করেন এবং আমাকে ও রানীকে একসঙ্গে ঝুলিয়ে দিয়ে রানীর বস্ত্র খুলে নেন। তারপর আমাদের দুজনকে দুদিক থেকে চাবুক মারতে থাকেন। জ্ঞান হারিয়ে ফেলি। জ্ঞান হলে দেখি দুজনেই মেঝেতে পড়ে আছি। রানীর সর্বাঙ্গ দিয়ে রক্ত ঝরছে। আমার গায়ে কাপড় থাকায় অপেক্ষাকৃত কম আহত হয়েছি। তবু এই রুগ্ন বৃদ্ধ দেহে এই আঘাতই মর্মান্তিক। সর্বাঙ্গ ব্যথায় জর্জরিত। তৃষ্ণায় বুক শুকিয়ে যাচ্ছে। নড়বার ক্ষমতা নেই। ওরা আমাদের দিকে তাকিয়ে নারকীয় হাসি হাসছে। এদের হুকুমে দুজন সিপাই আমাকে টেনে তুলল। আমি অতিকষ্টে দাঁড়াতে পারলাম। রানী পারল না।”
এমনি এক ভয়ংকর সময়ে দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন জিয়াউর রহমান (বীর-উত্তম)। তিনি শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেন। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা না পেয়ে সন্ত্রাসীরা আত্মগোপনে চলে যায়। বন্ধ হয়ে যায় গুম, খুন, অপহরণ, চাঁদাবাজি, লুণ্ঠন ও দুর্নীতি। ছাত্রীরা নির্বিঘ্নে স্কুল-কলেজে যেতে শুরু করল। মানুষ হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির এত উন্নতি হয় যে জিয়ার সময় মানুষ ঘরের দরজা খুলে ঘুমাতে পারত।
মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা : মৌলিক অধিকার ব্যতীত কোনো নাগরিক সামাজিক চেতনাবোধ বা মঙ্গল আসতে পারে না। তাই সমাজে মৌলিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। জিয়াউর রহমান যখন দেশের শাসনভার গ্রহণ করেন তখন এদেশের মৌলিক অধিকার সম্পূর্ণ স্থগিত রাখা হয়েছিল। তিনি প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের পর বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকারসমূহ বলবৎ করেন। আওয়ামী লীগ নেতা প্রেসিডেন্ট খন্দকার মোশতাক আহমদ জারীকৃত মার্শাল ল তিনি বাতিল করেন। তিনি হাইকোর্ট ও সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি নিয়োগের সময় প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করে নিয়োগ দিতেন। তার আমলে বিচার বিভাগ ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন। তিনি আমাদের শাসনতন্ত্রে জনগণের যে ১৮টি মৌলিক অধিকার স্বীকৃত ছিল সেগুলো একে একে পুনঃস্থাপিত করেন।
তৈরি পোশাক শিল্প খাত : বাংলাদেশের জিডিপিতে দীর্ঘকাল ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলছে তৈরি পোশাক শিল্প খাত। এ শিল্পের ভিত এবং মূল মানবসম্পদের ভিত গড়ে দিয়েছেন জিয়াউর রহমান। বস্ত্র খাতের উন্নয়ন করতে গিয়ে তিনি গার্মেন্টশিল্পের নতুন দিকের সন্ধান পান। বস্ত্র তৈরি ও বিপণনের পাশাপাশি তৈরি পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এই খাত থেকে যে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বিপুল কর্মসংস্থান সম্ভব তা প্রথম এসেছিল শহীদ জিয়ার উন্নয়ন চিন্তায় মশগুল মস্তিষ্ক থেকে। ১৯৭৮ সালের ৪ জুলাই অধুনালুপ্ত দক্ষিণ কোরীয় শিল্প গ্রুপ দেইউ-এর সাথে যৌথ উদ্যোগে চট্টগ্রামের কালুরঘাটে দেশ গার্মেন্টস স্থাপনের চুক্তি করা হয়। এরপর ১৩০ জন তরুণ-তরুণীকে তৈরি পোশাক প্রস্তুতের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণের জন্যে দক্ষিণ কোরিয়ার পুসানে পাঠানো হয়। এর মাধ্যমেই বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্পের অগ্রযাত্রা সূচিত হয়। তৈরি পোশাক শিল্পের বিকাশের জন্য স্পেশাল বন্ডেড ওয়্যারহাউসের প্রয়োজন ছিল। ১৯৭৮ সালে জিয়ার শাসনামলেই এই স্কিম চালু হয়। এটি চালু করার ফলে রপ্তানিকারকরা সরাসরি শুল্কমুক্ত কাঁচামাল আমদানির সুযোগ পায়। তার এই মহৎ উদ্যোগের ফলে স্বল্প সময়ে বাংলাদেশে গার্মেন্টশিল্প প্রতিষ্ঠিত হয়। ধীরে ধীরে এই শিল্পটি এখন বাংলাদেশের সবোর্চ্চ কর্মসংস্থানকারী ও বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শিল্প।
জনশক্তি রপ্তানি : বাংলাদেশের জিডিপিতে অবদান রেখে চলেছে এ রকম আরেকটি বড় খাত হচ্ছে রেমিট্যান্স। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়ার হাত ধরেই এর শুভ সূচনা ঘটে। দক্ষ জনশক্তি সৃষ্টির উদ্দেশ্যে তিনি ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) প্রতিষ্ঠা করেন। ওই বছরই শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বীয় উদ্যোগে মধ্যপ্রাচ্যের ৬টি দেশে সাড়ে ৮ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়। সেই থেকে এই ধারা ক্রমবর্ধমান আকারে অব্যাহত রয়েছে। বর্তমানে বিদেশে কর্মরত এক কোটিরও বেশি বাংলাদেশিদের প্রেরিত রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম নিয়ামক শক্তি।
ব্লু-ইকোনমি : উন্নত বিশ্বের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পেছনে ব্লু-ইকোনমির ভূমিকা অপরিসীম। ব্লু-ইকোনমি হচ্ছে, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে সমুদ্রের উপযোগিতা বৃদ্ধি। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশে সমদ্রকেন্দ্রিক এই ব্লু-ইকোনমির পথিকৃৎ। তার উদ্যোগেই ১৯৮০ সালের ১০ অক্টোবর সমুদ্রসম্পদ বিষয়ক প্রথম জাতীয় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে আইডব্লিউটিএ সাগরের বড়জোর ৪০ মাইল পর্যন্ত মাঝেমধ্যে অনুসন্ধান বিহার চালিয়েছে। ৬০০ ফুট পানির নিচে মৎস্য ও প্রাণী সম্পর্কেও বাংলাদেশের তথ্য জানা ছিল না। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের নভেম্বর মাস থেকে সামুদ্রিকসম্পদ অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন। সাগর ও মহাসাগরের সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণের জন্য জাতীয় কমিটি (এনসারসো) গঠন করা হয় এবং চট্টগ্রামে সমুদ্র বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ১৯৮১ সালের ১৯ থেকে ২১ জানুয়ারি দেশ সেরা একদল মেধাবী শিক্ষার্থী এবং বিজ্ঞানীদের নিয়ে ‘সামুদ্রিক সম্পদ অনুসন্ধান ও আহরণ সংক্রান্ত জাতীয় কমিটি’ একটি শিক্ষা সফর আয়োজন করে। সমদ্রগামী যাত্রীবাহী জাহাজ ‘হিজবুল বাহার’-এ চড়ে বঙ্গোপসাগরে এই ব্যতিক্রমধর্মী সফরে জিয়া অংশগ্রহণকারীদের সাথে মতবিনিময় করেন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল, বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বঙ্গোপসাগরের বিশাল সম্পদ ও সম্ভাবনার সাথে তাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া।
সমুদ্রের অফুরন্ত সম্পদ আহরণ ও গভীর সমুদ্র থেকে মাছ ধরার জন্য তিনিই প্রথম যান্ত্রিক মাছ ধরার ট্রলারের ব্যবস্থা করেন এবং সমুদ্রে মাছ শিকার করে তা রপ্তানির উদ্যোগ নেন। আজ এটাই আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি উৎস।
খাল খনন কর্মসূচি : শহীদ জিয়ার শাসনামলে কৃষিতে যে সবুজ বিপ্লবের সূচনা হয় তার গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সেচ। এই সেচব্যবস্থার উন্নয়ন, সহজলভ্য এবং টেকসই করার জন্য জিয়া খাল খননের যুগান্তকারী ঐতিহাসিক কর্মসূচি গ্রহণ করেন। শুকনা মৌসুমে কৃষক যেন নদীনালা ও খালের পানি দিয়ে জমিতে প্রয়োজনীয় সেচের ব্যবস্থা করে ফসলের নিবিড়তা বাড়িয়ে এবং বর্ষা মৌসুমে ফসলকে বন্যার হাত থেকে রক্ষা করে কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করে দেশকে খাদ্যে স্বয়ম্ভর করতে পারেন—এই মূল লক্ষ্য নিয়ে তিনি খাল খনন কর্মসূচি গ্রহণ করেন। সমগ্র দেশে স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে এই কর্মসূচিতে জনগণের সাথে তিনি নিজেও অনেক জায়গায় অংশ নিয়েছেন।
কোদাল হাতে প্রেসিডেন্ট জিয়া খাল কাটছেন—এ ছবি এখনো মানুষের দৃশ্যপটে ভেসে আছে। দেড় বছরে সারা দেশে প্রায় ১৪০০ খাল খনন ও পুনর্খনন করেন। ফলে দেশ স্বল্প সময়ের মধ্যেই খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করে।
ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্পে প্রণোদনা : দারিদ্র্য বিমোচনে গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ প্রকল্প এখন বাংলাদেশ ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বেই সমাদৃত। এ প্রকল্পের কারণে ড. ইউনূস এবং গ্রামীণ ব্যাংক নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন, যা আন্তর্জাতিক দরবারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। কিন্তু গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠার পেছনে চাপা পড়ে আছে জিয়ার অবদান। ১৯৭৬ সালে হাটহাজারীর জোবরা গ্রামে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন অধ্যাপক ড. ইউনূস পল্লী ব্যাংকিংয়ের একটি মাঠ পর্যায়ের গবেষণা করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল, প্রান্তিক জনগণের মাঝে জামানতবিহীন ঋণ সুবিধা প্রণয়নের সম্ভাব্যতা যাচাই করা। পাইলট প্রকল্পটি সফল হওয়ার পর বৃহৎ পরিসরে চালু করার ক্ষেত্রে বড় ফান্ডের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এ সমস্যা নিরসনে তখন এগিয়ে আসেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তাঁর নির্দেশনায় বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ফান্ডের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। প্রাপ্ত ফান্ড ব্যবহার করে ড. ইউনূস চট্টগ্রাম ও টাঙ্গাইলে সফলভাবে প্রকল্প সম্পন্ন করেন। এরপরে আর তাঁকে পেছনে তাকাতে হয়নি। সে সময়ে উদ্যোক্তাদের সরকারি ফান্ড থেকে টাকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেকের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও সম্ভাবনা বিচারে জিয়া ঝুঁকিটা নিয়েছিলেন। এ ছাড়া বিএডিসির মাধ্যমে প্রান্তিক চাষিদের জামানতবিহীন ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করেন তিনি। বেসরকারি শিক্ষকদের বেতনের ৫০% সরকারি খাত থেকে দেওয়ার যুগান্তকারী সিদ্ধান্তটি ছিল প্রেসিডেন্ট জিয়ার শিক্ষার প্রসারের উদ্যোগের অংশ।
রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধানে জিয়ার অবদান : বৃহত্তর চট্টগ্রামের এখন সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে রোহিঙ্গা। এটিকে বলা হয় কক্সবাজারের দুঃখ। রোহিঙ্গা নিয়ে যে সমস্যা, এর শুরু মূলত ১৯৭৮ সালের এপ্রিল। ওই সময় মায়ানমার সেনাবাহিনী কর্তৃক পরিচালিত ‘অপারেশন ড্রাগন’-এর শিকার হয়ে আরাকানে মুসলমানরা রোহিঙ্গা দলের সীমান্ত অতিক্রম করে বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। জিয়াউর রহমান নিজেই ইয়াঙ্গুন গিয়ে তৎকালীন বার্মা সরকারের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন সেই দেশের নাগরিকদের ফেরত নেওয়ার জন্য। পাশাপাশি জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ককে উদ্ধুদ্ধ করে জোরালো ভূমিকা পালনে। ফলস্বরূপ ১৯৭৮ সালের ৯ জুলাই বাংলাদেশের সঙ্গে মায়ানমারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পাদন হয়। মায়ানমার তিনটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করে সব রোহিঙ্গা শরণার্থীকে ফেরতে নিতে সম্মত হয়। ১৯৭৮ সালের ৩১ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ২৯ ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে আসা ১ লাখ ৮৭ হাজার ২৫০ রোহিঙ্গাকে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হয় জিয়াউর রহমান সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারও রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে বাস্তবসম্মত কূটনৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক উন্নয়ন : জিয়া ইন্দো-সোভিয়েত কক্ষপথ থেকে বাংলাদেশের গতিপথ পরিবর্তন করে বিশ্বময় বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করেন। তখনকার অন্যতম পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সঙ্গে হাজারও প্রকরণে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট হয়ে আবদ্ধ হয় বন্ধুত্বের দৃঢ় সূত্রে। আজকে বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যে সম্পর্ক, তার ভিত্তি রচিত হয় তখন। ইউরোপ তখন থেকে আগ্রহী হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং গতিশীল অর্থনীতির দূরপ্রাচ্য বন্ধুত্বের বার্তা নিয়ে বাংলাদেশের কাছাকাছি আসে তখন থেকেই। ছুটে আসে বিনিয়োগের ডালা সাজিয়ে। যে চীন এত দিন বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে রেখেছিল, সেই চীনের সঙ্গেও গড়ে ওঠে বাংলাদেশের হৃদ্যতা। ওই সময় থেকেই ৫৭টি রাষ্ট্রের সমন্বয়ে গড়া ইসলামী সম্মেলন সংস্থা (ওআইসি) তথা মুসলিমবিশ্ব বাংলাদেশের অকৃত্রিম মিত্রে পরিণত হয় জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রনায়কোচিত পদক্ষেপের জন্য। মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদাসম্পন্ন আল-কুদস কমিটির সদস্য হয় বাংলাদেশ। সৌদি আরব হয়ে ওঠে বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু। আরাফাত ময়দানে সারি সারি রোপিত নিমগাছ এখনো সৌদি আরব-বাংলাদেশের মধ্যে গভীর সেতুবন্ধের জীবন্ত সাক্ষ্য হয়ে রয়েছে। ইরাক-ইরান যুদ্ধাবস্থা নিরসনের দায়িত্ব আসে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ওপর। অন্যদিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ১৯৭৮ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে নির্বাচিত হয়ে আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনের সুযোগ লাভ করে। এখন শান্তিরক্ষী বাহিনীর মাধ্যমে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের নির্ভীক সেনানীরা যে ভূমিকা পালন করে চলেছেন, তার সূচনা তখন থেকেই। এমনি পরিবেশে যে ভারত সব সময় বাংলাদেশকে ‘তাদের সৃষ্টি’ বলে দাবি করে উদাসীন থেকেছে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও জনস্বার্থ সম্পর্কে, জিয়ার সৃষ্টিশীল নেতৃত্বে সেই ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ‘আধিপত্য-অধীনতা’ কাঠামো ছাড়িয়ে সহযোগিতার স্বর্ণসূত্রে গ্রথিত হতে থাকে। উভয়ের সম্পর্ক হয়ে ওঠে পারস্পরিক শ্রদ্ধার, সাম্যের এবং সম-সার্বভৌমত্বের। ভারত হয় বাংলাদেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য মিত্র।
সাংস্কৃতিক যাবতীয় অর্জনের মূলে জিয়া : আমাদের সাংস্কৃতিক যাবতীয় অর্জনের মূলে শহীদ জিয়ার অবদান অনস্বীকার্য। তার মতো করে এ ব্যাপারে এত গভীরভাবে কেউ ভাবেনি। তার বাস্তবোচিত কর্মকাণ্ডের ফলে এ দেশের সাংস্কৃতিক জগতে অভূতপূর্ব জাগরণ শুরু হয়েছিল। একুশে পদক, স্বাধীনতা পদকসহ নানা অর্জনের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির ব্যবস্থা তিনিই করেছিলেন। সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিষ্ঠাতা তিনিই ছিলেন।
বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বিষয়ক সর্ববৃহৎ গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলা একাডেমি। এ বাংলা একাডেমির উন্নয়নে যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে শহীদ জিয়া তার বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের উন্নয়নে তার অঙ্গীকার ও প্রত্যয় বাস্তব রূপ দেন। বাংলা একাডেমির সার্বিক উন্নয়ন ও এর কাঠামোগত বিকাশ সাধনে শহীদ জিয়া ১৯৭৮ সালের ৬ জুন ‘দ্য বাংলা একাডেমি অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৮’ জারি করেন। বাংলা একাডেমির পরিচালনায় এ অধ্যাদেশটি এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
স্বাধীন বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানই সর্বপ্রথম শিশু-কিশোরদের প্রতিভা ও মানসিক বিকাশের কথা চিন্তা করেছিলেন। বাংলাদেশ টেলিভিশনে চালু করেছিলেন ‘নতুন কুঁড়ি’ নামক এক সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতারও। এ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে এমন অনেক প্রতিভা বেরিয়ে এসেছেন, যারা আজ বাংলাদেশের সংস্কৃতি অঙ্গনে স্বমহিমায় উজ্জ্বল এবং তারা বাংলাদেশের সংস্কৃতির বিকাশ ও উন্নয়নে অনবদ্য অবদান রেখে চলেছেন।
বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর বাংলাদেশের ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক, নৃ-তাত্ত্বিক, শিল্পকলা ও প্রাকৃতিক ইতিহাস সম্পর্কিত নিদর্শনাদি সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রদর্শন ও গবেষণার উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান। শহীদ জিয়া এ জাদুঘরের উন্নয়নে নানা পদক্ষেপ নিয়েছিলেন।
বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী রয়েছে। ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর নিজস্ব সংস্কৃতি যেন বিলীয়মান না হয়ে পড়ে জিয়াউর রহমান এ বিষয়ে সচেতন ছিলেন। তাই এ সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও প্রচার-প্রসারের লক্ষ্যে রাঙামাটিতে ‘উপজাতীয় সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট’ (বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট’) এবং নেত্রকোনার দুর্গাপুরের বিরিশিরিতে ‘উপজাতীয় কালচারাল একাডেমি’ প্রতিষ্ঠা করেন।
শহীদ জিয়া বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশের লক্ষ্যে ঢাকার অদূরে গাজীপুরে একটি চলচ্চিত্র নগরী, ফিল্ম ইনস্টিটিউট ও আর্কাইভ প্রতিষ্ঠা, সৃজনশীল ও উন্নত মানের চলচ্চিত্র নির্মাণে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান এবং জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান অব্যাহত রাখেন। তিনি বাংলাদে টেলিভিশনের রঙিন ট্রান্সমিশন চালু করেন।
প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান গুম হয়েছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি, যা সেই সময়ে ব্যাপক আলোড়ন তুলেছিল। সেই জহির রায়হানকে জিয়াউর রহমান প্রথম রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মান জানালেন। ১৯৭৬ সালের প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে মরণোত্তর শাখায় তাঁকে পদক দেন। দ্বিতীয়বার সম্মান প্রদর্শন ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন ১৯৭৭ সালে দেওয়া একুশে পদকের মাধ্যমে। সুরকার আলতাফ মাহমুদ ১৯৭১ সালের আগস্ট মাসেই নিখোঁজ হয়েছিলেন। সেই আলতাফ মাহমুদকে রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি জানিয়েছিলেন শহীদ জিয়াউর রহমান। ১৯৭১ সালে নিখোঁজ হওয়া খ্যাতিমান সাহিত্যিক মুনির চৌধুরীকে সর্বপ্রথম রাষ্ট্রীয় সম্মান ও স্বীকৃতি দিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ১৯৮০ সালের স্বাধীনতা পদক প্রদানের মাধ্যমে।
সারা দেশের মেধাবী শিশু-কিশোরদের জাতীয় পর্যায়ে মেধা বিকশিত করার জন্য ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ টেলিভিশনের মাধ্যমে ‘নতুন কুঁড়ি’ প্রতিযোগিতা শুরু করেছিলেন, যা ছিল বিশ্বের প্রথম ‘ট্যালেন্ট হান্ট/রিয়ালিটি শো।’ এই প্রতিযোগিতা থেকেই আমরা পেয়েছিলাম কণ্ঠশিল্পী সামিনা চৌধুরী, অভিনেত্রী তারানা হালিম (সাবেক সংসদ সদস্য), মেহের আফরোজ শাওন, রুমানা রশীদ ঈশিতা, তারিন, তিশাসহ আরো অনেককে। আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর সর্বপ্রথম সারা দেশে জনপ্রিয় এই প্রতিযোগিতাটি বন্ধ করে দেয়। দ্বিতীয়বার চালুর পর ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর পুনরায় তা বন্ধ করে।
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকেও এগিয়ে নেওয়ার জন্য জিয়াউর রহমান নানা উদ্যোগ নিয়েছিলেন। একদিন জিয়া বঙ্গভবনে ডেকে পাঠালেন তৎকালীন সময়ের জনপ্রিয় ও ব্যস্ত নায়ক উজ্জ্বলকে। উজ্জ্বল ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স ও মাস্টার্স করা মেধাবী ছাত্র। উজ্জ্বলের সঙ্গে ইন্ডাস্ট্রির নানা বিষয় নিয়ে কথা বললেন। কিভাবে পাশের দেশের রঙ্গিন বাণিজ্যিক সিনেমাগুলোকে টেক্কা দিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারি, সেসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত কথা বললেন। চলচ্চিত্রের জন্য উজ্জ্বলকে একদিন ৬০ লাখ টাকা অনুদান দিলেন। পরিচালক আজিজুর রহমানের ‘ছুটির ঘণ্টা’ সিনেমার পেছনেও আছে জিয়াউর রহমানের অবদান। চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য জিয়ার আমলে যে কয়টি অত্যাধুনিক ক্যামেরা কেনা হয়েছিল সেগুলো দিয়ে ইন্ডাস্ট্রি চলেছে দুই দশক ধরে। জিয়াই এফডিসিতে ‘জহির রায়হান কালার ল্যাব’ প্রতিষ্ঠিত করে রঙিন সিনেমা বানানোর জন্য দেশেই সব ব্যবস্থা করে দিলেন। এফডিসির বেঙ্গল স্টুডিওকে করলেন আধুনিক, যেখানে অসংখ্য সিনেমার শুটিং হয়েছিল। মিষ্টি প্রেমের রোমান্টিক ও পারিবারিক সিনেমার ইমেজ ছেড়ে উজ্জ্বল বেরিয়ে এসে নির্মাণ করলেন ‘নালিশ’ সিনেমাটি। যার পরের ইতিহাসটা সবারই জানা। বরেণ্য পরিচালক খান আতাউর রহমানের জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র ‘ডানপিটে ছেলে’ নির্মাণের পেছনেও আর্থিক অনুদানসহ যাবতীয় সহযোগিতা করেছিলেন জিয়াউর রহমান।
১৯৮০ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের জন্য আর্থিক অনুদান প্রথা চালু করেছিলেন এবং সেই অনুদানে নির্মিত প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র হলো বাদল রহমানের ‘এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী’। স্বাধীন বাংলাদেশে এটিই হলো সর্বপ্রথম শিশুতোষ চলচ্চিত্র এবং এখন পর্যন্ত জাতীয় পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র শাখায় পুরস্কারপ্রাপ্ত একমাত্র শিশুতোষ চলচ্চিত্র। উল্লেখ্য যে একই বছর খান আতাউর রহমানের ‘ডানপিটে ছেলে’ নামে আরেকটি শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ হয়, যার পেছনেও রয়েছে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা। বাংলাদেশ শিশু একাডেমির একটি বিশেষ প্রকল্পের অনুদানে নির্মিত হয়েছিল ‘ডানপিটে ছেলে’। চলচ্চিত্রটি একই বছরেই জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে বিভিন্ন শাখায় (শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার, শ্রেষ্ঠ গীতিকার ও শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী) পুরস্কার লাভ করেছিল। সেই থেকে এ দেশে শিশুতোষ চলচ্চিত্র নির্মাণ শুরু হয়। যার ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছিলাম ‘ছুটির ঘন্টা’, ‘পুরস্কার’, ‘এতিম’, ‘মাসুম’, ‘রামের সুমতি’র মতো অসাধারণ কিছু বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র।
মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ‘কলমিলতা’। গল্পটা জিয়াউর রহমানেরই বলা। যা নির্মাণের জন্য রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান আর্থিক অনুদানসহ সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছিলেন।
গণমাধ্যমের বিকাশ ও স্বাধীনতা রক্ষায় জিয়া : প্রেসিডেন্ট জিয়া গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন, গণতন্ত্রের পূর্বশর্ত হচ্ছে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা। তাই তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমে সংবাদপত্র প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক সব কালাকানুন বাতিল ও শিথিল করে দেশের সব জায়গা থেকে সংবাদপত্র প্রকাশে উৎসাহ প্রদান করেন। তিনি রাজশাহী থেকে ‘দৈনিক বার্তা’ নামে একটি প্রথম শ্রেণির পত্রিকা প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। এ পত্রিকা ঘিরে সমগ্র উত্তরাঞ্চলে তথ্যপ্রবাহের ক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটে। বহু সাংবাদিকের কর্মসংস্থান হয়।
দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সমাজ সচেতন করে গড়ে তুলতে ‘কিশোর বাংলা’ নামে একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা প্রকাশে উদ্যোগী হন তিনি। পত্রিকাটি শিশু-কিশোরদের মধ্যে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছিল। ১৯৭৯ সালে তিনি ‘গণতন্ত্র’ নামে একটি রাজনৈতিক সাপ্তাহিক প্রকাশে পৃষ্ঠপোষকতা দেন। ওই বছরই রাষ্ট্রপতি জিয়ার প্রচেষ্টায় প্রকাশিত হয় জাতীয় পত্রিকা ‘দৈনিক দেশ’। পত্রিকাটির নামকরণ করেন খোদ জিয়াউর রহমান।
ডিক্লারেশনের শর্ত শিথিল করার কারণে সে সময় ঢাকা থেকে শুরু করে বিভাগীয়, জেলা এমনকি থানা পর্যায় থেকে দৈনিক, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও মাসিক পত্রিকা প্রকাশ হতে থাকে। এসব পত্রিকা টিকিয়ে রাখতে জিয়াউর রহমান সরকারি বিজ্ঞাপন বণ্টননীতিও শিথিল করেন। বিভিন্ন সরকারি, আধাসরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন বণ্টন ব্যবস্থা কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণমুক্ত করেন। একই সঙ্গে সরকারি বিজ্ঞাপনের ৬০ ভাগ ঢাকা থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় এবং বাকি ৪০ ভাগ মফস্বল থেকে প্রকাশিত পত্রিকায় বণ্টনের ব্যবস্থা করেন। এর ফলে সারা দেশে সংবাদপত্র প্রকাশনায় নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়।
১৯৭২ সালে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন (ডিইউজে) তৎকালীন সরকারের কাছে যে কয়েকটি মূল দাবি উত্থাপন করেছিল তার অন্যতম ছিল সাংবাদিকদের জন্য নতুন বেতন বোর্ড গঠন, প্রেস কমিশন গঠন এবং প্রে অ্যান্ড পাবলিকেশন্স অর্ডিন্যান্স বাতিল। পাকিস্তান আমলে ১৯৬১ সালে সাংবাদিকদের জন্য একটি বেতন বোর্ড গঠিত হয়। পরে আর কোনো সরকার নতুন বেতন বোর্ড গঠনের দাবিতে কর্ণপাত করেনি। বাংলাদেশ হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে একটি বেতন বোর্ড গঠিত হলেও তা ছিল অকার্যকর। রাষ্ট্রপতি জিয়া সংবাদপত্রসেবীদের বেতন-েভাতা নির্ধারণে ওয়েজ বোর্ড গঠন করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি বেতন বোর্ড পুনরুজ্জীবিত করেন এবং ১৯৭৭ সালের ১ মে ওয়েজ বোর্ড রোয়েদাদ ঘোষণা করা হয়। একই সঙ্গে ঘোষিত বেতন স্কেল বাস্তবায়নের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে ইমপ্লিমেন্টেশন সেলও গঠন করে দেন। তিনি সাংবাদিক, মালিক, সাংবাদিক ইউনিয়নের প্রতিনিধি ও সরকারি কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠন করেন প্রেস কনসালটেটিভ কমিটি। এ কমিটির কাজ ছিল স্বাধীন সাংবাদিকতার অন্তরায়গুলো দূর করা। সাংবাদিকদের হয়রানি ও নির্যাতন বন্ধ জিয়াউর রহমান প্রেস কাউন্সিল গঠন করেন।
দুরর্দশী রাষ্ট্রনায়ক জিয়া বুঝেছিলেন, মানসম্মত নির্মোহ সাংবাদিকতার জন্য সুশিক্ষিত সাংবাদিক প্রয়োজন। সাংবাদিকদের পেশাগত মান উন্নয়ন ও তাদের সুষ্ঠুভাবে প্রশিক্ষণ দেওয়ার জন্য তিনি বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট (পিআইবি) প্রতিষ্ঠা করেন নিজে উদ্যোগী হয়ে। পেশায় বিজ্ঞ ও বিদগ্ধ ব্যক্তিদের মাধ্যমে, এমনকি বিদেশ থেকে প্রশিক্ষক এনে তিনি সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ১৯৭৬ সালে ১৮ আগস্ট বাংলাদেশ প্রেস ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করা হয়। সে সময় আবাসন সংকটে সাংবাদিকরা ভীষণভাবে কষ্ট পাচ্ছিলেন। স্বল্প আয়ের সাংবাদিকদের আবাসন সমস্যা ও দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে তিনি মিরপুরে ২২ বিঘা জমি সাংবাদিক সমবায় সমিতির নামে বরাদ্দ করেছিলেন। দেড় শতাধিক সাংবাদিকের সেখানে আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছিল।
১৯৭৬ সালে তোপখানা রোডে পুরনো লাল বিল্ডিংয়ে প্রেস ক্লাব ভেঙে নতুন ভবন নির্মাণের তোড়জোড় চলছিল। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাত ব্যবসায়ী প্রিন্স করিম আগা খান প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণের ব্যয় বহনের ঘোষণা দেন। ক্লাব ভবনের ভিত্তি স্থাপন করতে এসে জিয়াউর রহমান বিষয়টি জানতে পারেন। তিনি স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেননি। সাংবাদিক নেতাদের ডেকে তিনি বলেন, প্রেস ক্লাব হচ্ছে একটি জাতীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এর উন্নয়ন মানে গণতন্ত্রের উন্নয়ন, সাংবাদিকতার প্রসার। অতএব, বিদেশি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর অর্থানুকূল্যে এ প্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মিত হওয়া উচিত নয়। তাহলে সাংবাদিকদের মর্যাদা ও নিরপেক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে। এটা নির্মিত হবে আমাদের নিজস্ব টাকায়। তিনি জানালেন, প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণের সব ব্যয়ভার গ্রহণ করবে সরকার। তিনি প্রেস ক্লাব ভবন নির্মাণের জন্য অনুদান প্রদান করেন।
প্রেস ক্লাবের বর্তমান জায়গাটি ১৯৭৪ সালে হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল। প্রেস ক্লাবের জন্য শেখ মুজিব সরকার মাত্র এক বিঘা জায়গা বরাদ্দ করেছিলেন শিল্পকলা একাডেমির পাশে। এ সিদ্ধান্তে সাংবাদিকরা ক্ষুব্ধ হন। কারণ বর্তমান প্রেস ক্লাবের স্থানটি ১৯৫৪ সালে তদানীন্তন সরকার সাংবাদিকদের দিয়েছিল। বর্তমান জায়গাটি ফিরিয়ে দেন রাষ্ট্রপতি জিয়া।
শিশুদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে জিয়া : শহীদ জিয়া বলতেন, যেকোনো জাতি গঠনের শুরু করতে হবে শিশুদের দিয়ে। কারণ আজকের শিশুই আগামীর ভবিষ্যৎ। সেই উদ্দেশ্যেই তিনি বেশ কয়েকটি পদক্ষেপ নেন। শিশুদের সংস্কৃতিক ও মেধা চর্চার জন্য জিয়া শিশু একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন এবং দেশের প্রতিটি বৃহত্তর জেলায় একাডেমির শাখা স্থাপন করেন। শিশুদের সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের লক্ষ্যে বিটিভিতে নতুন কুঁড়ি নামে একটি সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন, যা সরাসরি সম্প্রচার হতো। পরবর্তীকালে অনেক সুখ্যাত শিল্পী ওই নতুন কুঁড়িরই প্রডাক্ট। সারা দেশে মেধাবী শিশু ছাত্রদের অনুপ্রেরণা দেওেয়ার লক্ষ্যে তাদের জন্য একটি সম্মেলনের আয়োজন করেন এবং জিয়া সশরীরে সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের উদ্দেশে বক্তৃতা করেন। সেই সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী মেধাবী শিশুদের জন্য দিনটি ছিল স্মরণীয়। মেধাবী শিশুদের লালনের নিমিত্তে নির্মিত সামরিক মেরিট স্কুল ক্যাডেট কলেজের সংখ্যা চারটি থেকে আটটিতে উন্নীত করেন। সুস্থ অর্থবহ ও উন্নত শিশু চলচ্চিত্র নির্মাণের লক্ষ্যে তিনি রাষ্ট্রীয় অনুদানের ব্যবস্থা করেন। এই সময়ে বেশ কিছু ভালো ভালো শিশু চলচিত্র নির্মিত হয়, যেমন ছুটির ঘণ্টা, ডুমুরের ফুল, ডানপিটে ছেলেটি, অশিক্ষিত, এমিলের গোয়েন্দা বাহিনী, ইত্যাদি। জিয়ার শাসনামলে বিটিভিতেও খুব সুন্দর সুন্দর শিশুতোষ অনুষ্ঠান হতো। এর মধ্যে একটি ধারাবাহিক নাটক ছিল, ‘রোজ রোজ’। জিয়াউর রহমান ১৯৭৯ সালকে বাংলাদেশ শিশুবর্ষ ঘোষণা করেন। পুরো বছরজুড়ে শিশুদের জন্য সারা দেশে নানা রকম কর্মকাণ্ড হয়।
শিশুদের খেলাধুলা ও আনন্দ দানের ঢাকাতে একটি অত্যাধুনিক শিশু পার্ক প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৭৯ সালে উদ্ধোধন করলেন ‘ঢাকা শিশু পার্ক’। শুধু শিশুরাই নয়, হুমড়ি খেয়ে পড়ল ঢাকা শহর। এই পার্ক দেখে প্রতিটি শিশুরই মনে হয়েছিল, এ যেন এক রূপকথার জগৎ। শিশুদের অধ্যায়নের সুবিধার্থে জিয়া শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরির পাশেই একটি শিশু গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেন।
অখণ্ডতা রক্ষায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ : ১৯৮১ সালের ৯ মে ভারত বাংলাদেশের তালপট্টি দ্বীপে আগ্রাসন চালায়। দুটি যুদ্ধজাহাজ আইএনএস সন্ধায়ক এবং আইএনএস আন্দামান দক্ষিণ তালপট্টির কাছে বাংলাদেশ সীমানায় ঢুকে অবস্থান নেয়। ভারতীয় উর্দি পরা লোকেরা সেখানে কিছু ঘর, তাঁবু, একটি এরিয়াল মাস্তুল ও ভারতীয় পতাকা উড্ডীয়ন একটি দণ্ড দ্বীপ স্থাপন করে। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ১১ মে এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছে কঠোর প্রতিবাদ জানায়। ২৩ মে বিএনপি জাতীয় নির্বাহী কমিটির এক সভায় প্রেসিডেন্ট জিয়া বলেন, ‘দক্ষিণ তালপট্টির সমস্যা সমাধানে উপযুক্ত পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এ ব্যাপারে সরকার কোনো দ্বিধা করবে না।’ এরপর তারা তালপট্টি ছেড়ে চলে যায়।
ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের বৃহৎ অংশ মরুভূমিতে পরিণত হচ্ছিল। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সরকার পানি সমস্যা সমাধানে ইন্ডিয়াকে আলোচনায় বসার আহ্বান জানান। ইন্ডিয়া টালবাহনা শুরু করলে ১৯৭৬ সালের মে মাসে ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত ৪২ জাতি ইসলামিক পররাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলনে বিষয়টি উত্থাপন করা হয় এবং বাংলাদেশ সমর্থন পায়। একই বছর আগস্টে কলম্বোতে অনুষ্ঠিত জোট নিরপেক্ষ সম্মেলনেও বিপুল সমর্থন মেলে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবির পক্ষে। অবশেষে ইস্যুটি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নিয়ে যায় বাংলাদেশ। এরপর ভারত বাংলাদেশের সাথে ফারাক্কা নিয়ে বোঝাপড়ায় উপনীত হতে সম্মত হয়। ১৯৭৭ সালে ৫ নভেম্বর দুই দেশের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী ১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত যখন পানির প্রবাহ কম থাকবে তখন বাংলাদেশ পাবে ৬০ ভাগ পর্যন্ত ভারত পাবে ৪০ ভাগ।
নারী উন্নয়ন : শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করেছিলেন যে, দেশের উন্নয়নে নারী উন্নয়নের বিকল্প নেই। মোট জনসমষ্টির এই বিরাট অংশকে পিছিয়ে রেখে জাতীয় মুক্তি অসম্ভব। তাই দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাতেই জিয়া নারী উন্নয়নের জন্য বিশেষ কিছু পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। এই পরিকল্পনায় নারীকে উদ্যোক্তা হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। নারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের লক্ষ্যে ১৯৭৮ সালের ১১ ডিসেম্বর মহিলাবিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করা হয়। দেশের নারীদের ঐক্যবদ্ধ করা এবং তাদের মাধ্যমে সৃজনশীল কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করতে ১৯৭৬ সালের ১৬ এপ্রিল জাতীয় মহিলা সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। এর এক বছরের মধ্যেই ১৯৭৭ সালের ১৫ জানুয়ারি জাতীয় মহিলা একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়। জিয়া পুলিশ বাহিনীতে নারীর কর্মসংস্থান নিশ্চিত করেন। ১৯৭৬ সালের ৮ মার্চ সর্বপ্রথম পুলিশে নারীদের নিয়োগ দেওয়া শুরু হয়। তার আমলেই আনসার, ভিডিপি ও গ্রাম সরকারে নারীদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। মহিলাদের সরকারি চাকরি ও শিক্ষকতায় অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। নারীর ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে নারীদের জন্য সংসদীয় আসনের সংখ্যা ১৫ থেকে বাড়িয়ে ৩০ করা হয় জিয়ার আমলে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে নারীদের জন্য পদ সংরক্ষণসহ ১৯৭৬ সালের ৮ এপ্রিল সরকারি চাকরিসমূহে নারীদের জন্য কোটা সংরক্ষণের ঘোষণা দেওয়া হয়।
দক্ষ সেনাবাহিনী গঠন : জিয়াউর রহমান এমন একটি রুগ্ন সেনাবাহিনীকে সুস্থ, সবল করার কাজ হাতে নেন যখন সেনাবাহিনীর পর্যাপ্ত ইউনিফর্মও ছিল না। আজকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নিয়ে যারা নতুন করে গর্ব করেন তাদের প্রয়োজনে জানিয়ে রাখছি শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে অবহেলিত সেনাবাহিনীর ডিভিশন ছিল মাত্র ৫টি। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডিভিশন করেন ৯টি। সেনা সংখ্যা ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজারে বৃদ্ধি করেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সামরিক বাহিনীর একটি ক্ষুদ্র গ্রুপ দ্বারা সংঘটিত অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হলেও এটা সত্য যে, তিনিই সামরিক বাহিনীতে ঐক্য, সংহতি ও শৃঙ্খলা ফিরিয়ে এনেছিলেন। উন্নত প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্রের সমন্বয়ে, সম্মানজনক বেতন-ভাতা প্রদানের মাধ্যমে তিনি সামরিক বাহিনীর মনোবল ও মর্যাদাকে উন্নত স্তরে নিয়ে গিয়েছিলেন। জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনী হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন।
চারণ রাজনীতিক : আমরা চারণ কবির কথা শুনেছি। শুনেছি চারণ সাংবাদিকের কথা। বাংলাদেশে চারণ রাজনীতিক একজন—জিয়াউর রহমান। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান মানুষকে এত বেশি আপন করে নিয়েছেন যে রাষ্ট্রীয় প্রটোকল উপেক্ষা করে, নিজের নিরাপত্তার কথা না ভেবে গাড়ি থেকে নেমে মাইলের পর মাইল হেঁটেছেন। রাস্তার দুই ধারে হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দুই হাত বাড়িয়ে রেখেছেন আর জিয়া তাদের মাঝখান দিয়ে দুই হাত দুই দিকে বাড়িয়ে ধরে এগিয়েছেন। সালাম, আদাব জানাচ্ছেন ও নিচ্ছেন। এ দৃশ্য ছিল অভূতপূর্ব ও অভাবনীয়। কোনো অহংকার ছিল না। মিশে যেতেন সবার সাথে। জাতীয় ঐক্যের জন্য জিয়ার এই গণমুখী সফর ছিল অপরিহার্য।
প্রেসিডেন্ট জিয়া রাষ্ট্রীয় কাজ সম্পন্ন করে সুযোগ পেলেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চল সফর করতেন। সমতল-পাহাড় সবখানে ছিল তাঁর বিচরণ। তাঁর এসব সফরের উদ্দেশ্য ছিল একাধিক। বিশেষ করে স্থানীয় সমস্যা ও সম্পদের সাথে পরিচিত হওয়া। দেশ ও জনগণকে কাছ থেকে জানা এবং উৎপাদন ও আয় বাড়ানোর উপায় সম্বন্ধে জনগণকে অবহিত করা। তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন গ্রাম বাঁচলে বাংলাদেশ বাঁচবে।
জিয়া নিজে যেভাবে প্রান্তিক জনগণের কাছে পৌঁছে যেতেন, তেমনি সরকারি অফিসারদেরও যেতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। যেসব সরকারি কর্মকর্তা এত দিন লোকচক্ষুর অন্তরালে থেকে শুধু নির্দেশ দিয়েছেন, জিয়াউর রহমান তাদের সাথে নিয়ে মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে জনগণের দোরগোড়ায় হাজির করেছেন। জনসাধারণের সামনে তাদের জনগণের সেবক হিসেবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। এতে সরকারি অফিসার ও জনগণের মধ্যে একটা সেতুবন্ধ তৈরি হয় এবং জনগণের মধ্যে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে দেশের তরুণ-তরুণীদের তিনি বিশাল কর্মোৎসবে শামিল করে যে নতুন গতিপথের দিকনির্দেশনা দান করেন, বাংলাদেশে তা অভিনব। এই রাজনীতি জনগণের রাজনীতি। অবশ্যই তিনি এর নাম দিয়েছিলেন উন্নয়ন ও উৎপাদনের রাজনীতি।
স্টেটসম্যান জিয়া : সাধারণ রাষ্ট্রনায়কদের সাথে স্টেটসম্যানদের সূক্ষ্ম অথচ বিশাল একটা পার্থক্য করা হয়ে থাকে। স্টেটসম্যানরা বর্তমান-ভবিষ্যৎ উভয় কালেই বিচরণ করেন অনায়াসে। সরল বাংলায় তাদের বলা যায় ভবিষ্যৎদ্রষ্টা, স্বপ্নদ্রষ্টা। তারা জাতির অনাগত ভবিষ্যতের স্বচ্ছ ছবি এঁকে বর্তমানকে সাজাতে থাকেন। পৃথিবীর ইতিহাসে স্বল্পসংখ্যক মানুষই পেরেছেন জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে স্টেটসম্যান হওয়ার গৌরব অর্জন করতে। তাদের ছোঁয়ায় ঘুমন্ত, হতাশাগ্রস্ত, সমস্যাপীড়িত জাতি জেগে ওঠে, নতুন উদ্যমে শুরু হয় সব কিছু। শত সমস্যা মোকাবেলা করে জাতি তখন এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা পায়। এককথায় জাতিকে এই মহান ব্যক্তিরা স্বপ্ন দেখাতে পারেন। যে স্বপ্ন বুকে ধারণ করে সব বাধা অতিক্রম করে একটি জাতি এগিয়ে যায় সম্মুখপানে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ক্ষণজন্মা সেসব স্টেটসম্যানেরই একজন। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, জাতিসত্তাসহ নানা দিক থেকে বিপর্যস্ত, তলাবিহীন ঝুড়ি আখ্যাপ্রাপ্ত একটি সদ্য স্বাধীন দেশের জন্য আশীর্বাদ হয়েই তিনি এসেছিলেন। স্টেটসম্যানসুলভ দূরদৃষ্টি নিয়ে তিনি এঁকে ফেলেছিলেন এ দেশের উন্নয়নের রূপকল্প। সমগ্র জাতির প্রাণে সৃষ্টি করেছিলেন এক অন্য রকম স্পন্দন। জাতি গঠনের এক মহাপরিকল্পনা নিয়ে নেমে পড়েছিলেন। রাষ্ট্রের এমন কোনো সেক্টর ছিল না, যেটাতে তিনি তরঙ্গ সৃষ্টি করতে পারেননি।
এ ছাড়া নানা কারণে প্রেসিডেন্ট জিয়া স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি প্রশাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনেন এবং বাংলাদেশকে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ার পথ বাতলে দেন। এমন এক সময় তিনি দায়িত্ব হাতে নেন, যখন বাংলাদেশকে বলা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। কিন্তু জিয়াউর রহমান স্বল্প সময়ে দেশকে সেই লজ্জা থেকে উদ্ধার করেন। জিয়া দায়িত্ব নেওয়ার আগে এ দেশে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। খাদ্যাভাবে একজনের বমি অন্যজনকে খেতে হয়। খাবার নিয়ে মানুষ আর কুকুরকে টানাটানি করতে দেখা যায়। সে সময় বস্ত্রের অভাবে বাসন্তীদের মাছ ধরার জাল পেঁচিয়ে ইজ্জত রক্ষা করতে হয়। জিয়া দেশকে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার উদ্যোগ নেন এবং এ কাজে তিনি এতটা সফল হন যে, বাংলাদেশ আশির দশকের গোড়ার দিকে চাল রপ্তানি শুরু করে। এটাই হচ্ছে দেশপ্রেম ও নেতৃত্বের গুণ।
জিয়া ছিলেন অতি দূরদর্শী এক স্বাপ্নিক পুরুষ। তিনি শুধু বাংলাদেশের শান্তি-শৃঙ্খলা নিয়ে ভাবতেন না, তিনি বিশ্ব শান্তির জন্যও কাজ করে গেছে। তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় তাৎপর্যময় ভূমিকা রাখে। বাংলাদেশ আল কুদস কমিটির সদস্যপদ অর্জন করে এবং ইরান-ইরাক মধ্যকার যুদ্ধ বন্ধ করতে জিয়া অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। নিরাপত্তা কাউন্সিলের নির্বাচনে বাংলাদেশের বিজয় ছিল বিপুল সম্মানের বিষয়। আর এটা ছিল বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় জিয়ার ভূমিকারই যথাযোগ্য স্বীকৃতি।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো নিয়ে তিনি ‘সাউথ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশন (সার্ক) গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। জিয়া এমন এক সময়ে এ ধরনের সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেছিলেন, যখন দক্ষিণ এশিয়ার কোনো শক্তিই এ সাতটি রাষ্ট্রকে একত্রে বসানোর কথা ভাবতেও পারেনি তাদের বিভেদাত্মক সম্পর্কের কারণে।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর থেকে ১৯৮১ সালের ৩০ মে মাত্র সাড়ে ৫ বছর রাষ্ট্র পরিচালনায় যুক্ত ছিলেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে বদলে ফেলেছেন। পশ্চাদমুখী ও সংকীর্ণ সামন্তচিন্তার অর্গল ভেঙে তিনি বাংলাদেশকে স্থাপন করেছেন সম্মুখপ্রসারী, উদার ও আধুনিক ধারায়।
জিয়া জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিটি বিষয়ে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গেছেন। রাজনীতি, অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, সংস্কৃতি, ক্রীড়া, জাতীয়তাবোধ সব কিছুতেই একটা বিপ্লব ঘটিয়েছেন। তিনি রাজনীতিকে প্রাসাদ বন্দি না করে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সারা দেশে। একটি দৃঢ় জাতীয় সংহতি সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। পরিচয় সংকটে আক্রান্ত হীনম্মন্যতায় ভোগা জাতিকে আপন স্বাধীন স্বকীয়তার পরিচয় তিনি দিতে পেরেছিলেন। আর সে পরিচিতি বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের সংমিশ্রণে হাজার বছরের যে রসায়ন তারই আবিষ্কার জিয়া ঘটিয়েছিলেন। আজ এ দেশে যেখানেই উন্নয়ন, উৎপাদন ও নির্মাণের স্বাক্ষর রয়েছে সেখানেই মিলবে তার গণমুখী ও কল্যাণকর পরিকল্পনার ছোঁয়া।
কবি ও সাংবাদিক আহমদ মূসায় ভাষায় বলতে হয়, ‘তিনি ছিলেন আমৃত্যু সৈনিক। কেবল বারবার বদলে গেছে তার রণাঙ্গন। তার রণক্ষেত্র ব্যাপৃত ছিল বারুদের সশস্ত্র গর্জনতা থেকে ভূমির মায়াবী বুকের সোনালি শস্য পর্যন্ত, খালের প্রবাহিত কলধ্বনির স্বচ্ছ জলরাশি থেকে অশীতিপর বৃদ্ধার আবেগের অশ্রুবিন্দু পর্যন্ত। তাঁর প্রত্যয় ছিল পর দেশের আধিপত্য থেকে মুক্ত থাকার এবং সে জন্যই হয়তো ভিনদেশি গোয়েন্দা উচ্ছেদ তালিকায় লিপিবদ্ধ ছিল তার নাম। বারবার বদলে গেছে তার রণক্ষেত্র পরিবর্তন করতে হয়েছে যুদ্ধাস্ত্র। প্রতিটি রণাঙ্গনে লড়ে গেছেন নিপুণ যোদ্ধার মতো পিছু হটে। অস্ত্র বারুদের উদ্দাম গর্জনতার মধ্যে তার দুরন্ত সাহস, জাতির সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সময় একাত্তরে আমাদেরও সাহসী করে তুলেছিল। ইথারে ভেসে আসা তাঁর কণ্ঠের কয়েকটি পঙক্তি হয়ে পড়েছিল প্রেরণা ও সাহসের উৎস। সেই প্রথম জানতে পারি তাঁর কথা। আমাদের সম্মান শ্রদ্ধার মিছিলে যুক্ত হয়েছিল তাঁর নাম জিয়াউর রহমান।’
সত্যি বলতে কি শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বেঁচে ছিলেন মাত্র ৪৫ বছর, হেঁটেছিলেন হাজার বছর। বাংলাদেশকে একটি শরীর ধরা হলে তার প্রাণ হলো জিয়াউর রহমান।
